সর্বশেষ সংবাদ
প্রচ্ছদ / সচেতনতা / জামের পুষ্টিগুণ উপকারিতা এবং সতর্কতা 🍇

জামের পুষ্টিগুণ উপকারিতা এবং সতর্কতা 🍇

আরমান হোসেন ডলার (বিশেষ প্রতিনিধি) বগুড়াঃ

জৈষ্ঠ্য মাসের আরেক নাম হলো মধু মাস। এ মাস নানা রকম রসালো ফলে ভরপুর থাকে। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু আরও কতো কি। রসালো ও মজাদার ফলের একটি হচ্ছে কালো জাম।

আর সেই জামের সম্পকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং গুণাবলী তুলে ধরেছেন চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ, মোঃ আরমান হোসেন ডলার, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়া।

জাম পছন্দ করে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। শুধু মজাদারই না এ ফলের রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণও। ফলের আকার অনুযায়ী আমাদের দেশে দুই ধরনের জাম পাওয়া যায় যেমন বড় জাম বা কালোজাম এবং ছোটজাম। অন্যান্য মৌসুমি ফলের তুলনায় এর স্থায়ীত্বকাল কম হলেও এর অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে।

জাম (ইংরেজি: Java plum, Jambul, Malabar plum), বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium cumini, Myrtaceae পরিবারভুক্ত একটি ফল। জাম নানা দেশে নানা নামে পরিচিত, যেমন- জাম্বুল, জাম্ভুল, জাম্বু, জাম্বুলা, জাভা প্লাম, জামুন, কালোজাম, জামব্লাং, জাম্বোলান, কালো প্লাম, ড্যামসন প্লাম, ডুহাট প্লাম, জাম্বোলান প্লাম, পর্তুগিজ প্লাম ইত্যাদি। তেলেগু ভাষায় একে বলা হয় নেরেদু পান্ডু, মালায়ালাম ভাষায় নাভাল পাজহাম, তামিল ভাষায় নাভা পাজহাম এবং কানাড়া ভাষায় নেরালে হান্নু। ফিলিপাইনে একে বলা হয় ডুহাট।

পুষ্টিগুণে অতুলনীয় এ ফলটিতে আছে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, স্যালিসাইলেট, গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফুকটোজসহ অসংখ্য উপাদান।

পুুষ্টি বিশ্লেষণে জামে পাওয়া যায় পানি ৮৩.১৩ গ্রাম, আমিষ ০.৭২ গ্রাম, শর্করা ১৫.৫৬ গ্রাম, ফ্যাট ০.২৩ গ্রাম, আয়রন ০.১৯ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৯ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ১৭ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ১৫ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৭৯ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ১৪ মিলিগ্রাম, থায়ামিন (ভিটামিন-বি১) ০.০০৬ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লাবিন (ভিটামিন-বি২) ০.১২ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন (ভিটামিন-বি৩ ) ০.২৬০ মিলিগ্রাম, প্যানথোনিক অ্যাসিড (ভিটামিন-বি৫) ০.১৬০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-বি৬ ০.১৬০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-সি ১৪.৩ মিলিগ্রাম।

আসুন জেনে নেই জামের পুষ্টিগুণঃ

জামে থাকা ভিটামিন ‘সি’ গরমে ঠান্ডাজনিত জ্বর, কাশি ও টনসিল ফুলে যাওয়া প্রতিরোধ করে। দূর করে জ্বর-জ্বর ভাব। আর দাঁত, চুল ও ত্বক সুন্দর করতেও এর অবদান অপরিসীম।

জামের ভিটামিন ‘এ’ দৃষ্টিশক্তিকে করে শক্তিশালী।
ক্যানসারের জীবাণু ধ্বংস করার জন্য জামে রয়েছে চমকপ্রদ শক্তি। জাম মুখের ক্যানসার প্রতিরোধে দারুণ কার্যকরী।

বৃদ্ধ বয়সে চোখের অঙ্গ ও স্নায়ুগুলোকে কর্মময় করতে সাহায্য করে। গর্ভবতী মা, বাড়ন্ত শিশুদের জন্যও এই ফল ভীষণ উপকারি।

জামে গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ রয়েছে, যা মানুষকে জোগায় কাজ করার শক্তি।

মানুষের স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে সাহায্য করে জাম।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইব্লাড প্রেসার ও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম ভীষণ উপকারি।

দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে মলদ্বারে টিউমার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জামের বাইরের আবরণে থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ। আঁশজাতীয় খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। জাম মলদ্বার বা কোলনের ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

জামের মধ্যে পাওয়া ইলাজিক নামক অ্যাসিড ত্বককে করে শক্তিশালী। ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করে। এই ইলাজিক অ্যাসিড ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

পাকা জাম বিট লবণ মাখিয়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা রেখে ছেঁকে রস বের করে নিন। এই রস খেলে পাতলা পায়খানা, অরুচি ও বমিভাব দূর করে।

এ ছাড়া জামের পাতা ও জামগাছের ছাল চূর্ণ নানা রোগের ওষুধ ও প্রতিষেধক। ঠা-াজনিত জ্বর, কাশি ও টনসিল ফুলে যাওয়া প্রতিরোধ, জ্বর জ্বর ভাব দূর এবং দাঁত, চুল ও ত্বক সুন্দর করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতেঃ

জামে রয়েছে ফাইটো কেমিক্যালস ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যেমন মৌসুমি সর্দি-কাশি ও ইনফেকশনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ। জামে এক ধরনের এসিড রয়েছে যা ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ত্বককে শক্তিশালী করে। এছাড়া ক্ষতিকর আল্ট্রা-ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করতেও জামের ভুমিকা রয়েছে।

জাম ফলে গ্লোকোজ, ডেক্সটোজ ও ফ্রুকটোজ উপাদান থাকায় তা কাজ করার প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয় । বয়স বাড়ার সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে। স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে জামের ভুমিকা রয়েছে। তাই সব বয়সী মানুষের এই মৌসুমি ফলটি খাওয়া উচিত।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জামঃ

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম অনেক উপকারী। এটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। তাছাড়া এটি ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খাওয়ার ফলে মানুষের ডায়াবেটিস উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চা চামচ জামের বীচির গুঁড়া খেলে ডায়াবেটিস অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ভিটামিন সি এর ঘাটতিজনিত রোগ দূরীকরণেঃ

জামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকার জন্য এটি দেহে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়া, দাঁত ও দাঁতের মাঢ়ি মজবুত, ক্ষয়রোধে সহ মুখের দুর্গন্ধ রোধেও জামের জুড়ি নেই। জামে রয়েছে পানি, লবণ ও পটাসিয়ামে যা গরমের সময় শরীর ঠান্ডা এবং শারীরিক দুর্বলতাকে দূর করতে সহায়তা করে। এতে বেশি পরিমাণের আয়রন থাকায় রক্তস্বল্পতা দূরীকরণে বিশেষ ভুমিকা রাখে। যাদের মাঢ়ি আলগা হয়ে গেছে, একটুতেই রক্ত পড়ে, তারা জামছালের গুঁড়া দিয়ে দাঁত মাজলে উপকার পারেন।

উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে হার্ট ভালো রাখতেঃ

পুষ্টিবিদ এবং চিকিৎসকরা তাজা ফল এবং সবজি খাওয়ার কথা বলে থাকেন। জামে যেসব উপাদান আছে তা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। জাম শরীরের দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা হ্রাস করে দেহের প্রতিটি অংশে অক্সিজেন সরবরাহ কার্যক্রমে সহায়তা করে। এছাড়া রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হৃদপিন্ড ভালো রাখতে জামের ভুমিকা রয়েছে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে জামের ভুমিকাঃ

জামে ক্যালোরির পরিমাণ অনেক কম থাকে। তাই যারা ওজন নিয়ে চিন্তায় করছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন তাদের খাদ্য তালিকায় জাম রাখা যেতে পারে।

রক্ত আমাশয় দূরীকরণেঃ

রক্ত আমাশয় দূরীকরণে জামের কচি পাতার রস ২-৩ চা চামচ একটু গরম করে ছেঁকে নিয়ে খেলে ২-৩দিনের মধ্যে তা সেরে যায়।

পচা ঘা বা ক্ষত সারাতেঃ

পচা ঘা বা ক্ষত সারাতে জাম পাতা সিদ্ধ করে সেই কাথ দিয়ে ঘা ধুয়ে দিলে ২-৪ দিনের মধ্যে অনেক উপকার পাওয়া যায়। যে ঘা (ক্ষত) তাড়াতাড়ি সেরে উঠছে না, সেখানে জাম ছালের মিহি গুঁড়া ছড়িয়ে দিলে ক্ষত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হয়ে যায়। পশুপাখির ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে কালো জাম উপকারীঃ

জাম মুখের ভেতর উৎপাদিত ক্যান্সারের সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব মুক্ত করে মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া জরায়ু ডিম্বাশয় ও মলদ্বারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে জামের কার্যকারিতা প্রমানিত ।

জৈব কীটনাশক হিসেবে জামের ব্যবহারঃ

জাম পাতার রস শস্য বীজ শোধনে ব্যবহার করা যায়। জামের পাতা পিসে রস করে ১:৪ অনুপাতে দ্রবণ তৈরি করে শস্য ও সবজি বীজ শোধন করা যায়।

শরীর ঠান্ডা রাখেঃ

একটি জামে ৮৮ শতাংশ মিনারেল থাকা। এ ছাড়াও ফসফরাস এবং আয়োডিনের মতো খনিজগুলো একসঙ্গে থাকায় জাম খেলে শরীর আর্দ্র থাকে। গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন অল্প পরিমাণে জাম খাওয়া উচিত।

সকালের নাস্তায় ২ কাপ বিচি ছাড়া জাম, ১ কাপ পানি এবং ১ কাপ বরফ মিশিয়ে স্মুদি তৈরি করে নিন। এর সঙ্গে কালো মরিচের গুঁড়ো, লবণ, মধু এবং পুদিনা দিয়ে মজাদার এক শরবত তৈরি করে খেলে সারাদিনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।

হাড়কে শক্তিশালী করেঃ

জামে আছে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপদানসমূহ। যা হাড় এবং আমাদের দাঁত মজবুত করে।

এজন্য এক গ্লাস দুধের সঙ্গে আধা চা চামচ শুকনো জামের গুঁড়ো খেতে পারেন। এ ছাড়াও প্রতিদিন ছোট এক বাটি জাম খেতে পারেন। এতেও উপকার মিলবে দ্রুত।

ব্রণ দূর করেঃ

জামে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা ব্ল্যাকহেডস, পিম্পলস এবং ব্রণসহ ত্বকের যাবতীয় সমস্যা সমাধান করে। রক্ত পরিশোধিত হওয়ার কারণেই ত্বক পরিষ্কার হয়ে যায় জাম খেলে। ত্বকের পাশাপাশি চোখের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটায় জাম।

হজমক্ষমতা বাড়ায়ঃ

জামে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার আছে, যা লিভারকে সক্রিয় করে এবং হজমক্ষমতা বাড়ায়। কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যাও দূর করে জাম।

জাম খাওয়ার আগে সতর্কতা মানা জরুরিঃ

★ প্রতিদিন ১০০ গ্রামের বেশি জাম খাবেন না।
★ জাম খাওয়ার আগে লবণ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

★ খালি পেটে কখনো জাম খাবেন না।
★ জাম খাওয়ার আগে ও পরে প্রায় ২ ঘণ্টা দুধ খাবেন না।

★ গর্ভবতী এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের জাম না খাওয়াই ভালো।

★ ডায়াবেটিস রোগীরা অবশ্যই জাম অল্প পরিপাণে খাবেন।

★ ফলের পাশাপাশি জামের মধু, ভিনেগার খেতে পারেন।

★ এ ছাড়াও জামের পাতা এবং ছাল শুকিয়ে গুঁড়ো করে খেলেও উপকার মিলবে।।

Advertisement

Check Also

মান্দায় সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন

  নওগাঁ জেলা ভ্রাম্যমান প্রতিনিধিঃ হাবিবুর রহমান (হাবিব) নওগাঁর মান্দায় প্রসাদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অতিরিক্ত ফি …